বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
দরসে নেজামির অনেকগুলো উদ্দেশ্য আছে। এর অন্যতম বড় উদ্দেশ্য হল, মূল উৎস (مصادر أصلية) থেকে উলুমে ইসলামিয়া আয়ত্ত করার যোগ্যতা অর্জন।
এই যোগ্যতার অনেক ধাপ আছে , স্তর আছে। এর প্রাথমিক স্তর হল,
১. সহিহ ই‘রাব দিয়ে বিশুদ্ধভাবে ইবারত পাঠ করতে পারা।
২. তারকিব বুঝতে পারা। তারকিব বোঝার অর্থ হল,
o ضمير এর مرجع বোঝা,
o اسم اشارة এর مشار إليه বোঝা,
o حال ও তার তারকিব বোঝ,
o মুবতাদা, খবর বোঝা
o ফেয়েল ফায়েল বোঝা ইত্যাদি
৩. সাবলীল অনুবাদ করতে পারা।
৪. ইবারতের সঠিক মতলব বা উদ্দেশ্য বুঝতে পারা।
সঠিকভাবে ইরাব দিতে পারা, তারকিব বোঝা, সাবলীর অনুবাদ করতে পারা এবং সঠিক মতলব অনুধাবন করা। --এই চারটি যোগ্যতার সমন্বয়ই মূলত কিতাবি ইস্তেদাদের প্রাথমিক স্তর।
এখন কথা হল এই প্রাথমিক যোগ্যতাটা কিভাবে অর্জন করব?
এর জন্য মৌলিকভাবে তিনটি উসূল মনে রাখতে হবে। আমল করতে হবে--
১. কিতাব ও মতন নির্ভর পড়াশোনা করতে হবে, شرح বা নোট নির্ভর পড়াশোনা করা যাবে না।
মতন নির্ভর পড়াশোনার অর্থ হল, মতন থেকে উদ্দিষ্ট বিষয়টি আয়ত্ত করার
সর্বাত্মক চেষ্টা করা। এর জন্য প্রথমে অন্তত তিন বার চূড়ান্ত মনোযোগ সহকারে
মতন পড়তে হবে। এবং মতন থেকে মাসআলাটা বোঝার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। যদি পর্যাপ্ত চেষ্টা করার পরও মতন থেকে মাসআলা বুঝে না আসে, তাহলে হাশিয়ার সহযোগিতা নেওয়া যাবে। এরপরও যদি বুঝ না আসে, তাহলে শরাহের সহযোগিতাও নেওয়া যাবে। তবে শর্ত হল, হাশিয়া ও শরাহ অবশ্যই আরবি হতে হবে। বাংলা বা উর্দূ হওয়া চলবে না।
আর শরাহ নির্ভর পড়ালেখার অর্থ হল, উদ্দিষ্ট মাসআলা মূল মতন থেকে না বুঝে শরাহ বা নোট থেকে বোঝার প্রবণতা।
২. আরবি নির্ভর পড়ালেখা করতে হবে, বাংলা বা উর্দূ নির্ভর পড়ালেখা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে।
আরবি নির্ভর পড়ালেখার অর্থ হল, আরবিকে বোঝার মূল মাধ্যম বানানো। আর বাংলা বা উর্দূ নির্ভর পড়ালেখার অর্থ হল, আরবিকে ভয় করে বাংলা বা উর্দূ কিতাবাদি পড়া এবং সেখান থেকে কাজ সেরে ফেলার ধোঁকায় পড়া।
হ্যা. মাসআলা বোঝার পর, আরবি ব্যাখ্যা গ্রন্থ মুতালার পর বাড়তি এতমিনানের জন্য প্রথমে উর্দু তারপর বাংলা শরাহ দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত জ্ঞানের জন্য বাংলা বা উর্দূ কিতাবাদি মুতালা করতে দোষ নেই। যেমন কাফিয়ার একটি মাসআলা হল করার পর মাথায় এল, দেখি দেওবন্দ ওয়ালারা কী লিখেছেন। বা বাংলাদেশের বাংলা ব্যাখ্যা গ্রন্থ লেখকরা কী লিখেছেন। বা তারা
কিভাবে মাসআলাটা উপস্থাপন করছেন। তাদের লেখায় নতুন কোনো জিনিস এসেছে
কিনা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে পড়াটা দোষ নয়। বরং প্রশংসার বিষয়। এটা সহযোগিতা নেওয়া।
এটা উর্দূ বা বাংলা নির্ভর লেখাপড়া নয়। তাই এতে কোনো সমস্যা নেই।
৩. ইলম নির্ভর পড়ালেখা করা, পরীক্ষা নির্ভর পড়া লেখা না করা।
পরীক্ষা নির্ভর পড়ালেখার অর্থ হল, মাসআলা বোঝার দরকার নেই। দরকার হল,
পরীক্ষায় পাস করা বা সনদ অর্জন করা। তাই পুরো কিতাব না পড়া। শুধু মহল্লে ইমতেহান পড়া। মাসআলার গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা না করা। শুধু গাইড পড়া বা বিগত বছরগুলির প্রশ্ন সাজেশন ও তার উত্তর সাজেশন পড়া এবং এর পেছনেই রাত দিন মাটি করা।
মনে রাখবে, পরীক্ষা ও সনদ নির্ভর পড়ালেখা আমাদের কাওমি মাদরাসার মেযাজের খেলাফ। বেফাক, হাইয়ায় মুমতায হওয়াই ইস্তেদাদের প্রধান মানদণ্ড নয়।
উপরোক্ত তিনটি উসুল সামনে রেখে ইস্তেদাদের প্রাথমিক স্তর অর্জনে আমাদেরকে নিম্নোক্ত কাজগুলো নিয়মিত করতে হবে। এক্ষেত্রে থানভী রাহ. এর বিখ্যাত উক্তিই শুধু উল্লেখ করতে চাই। তিনি তার “নাসিহুত
তলাবা” গ্রন্থে বলেন, যে ছাত্র এই চারটি কাজ করবে, তার আলেম হওয়ার জিম্মাদার আমি আশরাফ আলি!!
কাজ চারটি হল,
১) সামনের সবক পড়ে দরসে বসা।
এখানে সবক পড়ার সময় আগের চারটি বিষয় খেয়ার করে পড়তে হবে। সেগুলো
আবার বলছি--
নিজে নিজে ইবারত পড়া
নিজে নিজে তারকিব করা
নিজে নিজে অর্থ করা
নিজে নিজে মতলব বের করা
এক্ষেত্রে ফরকে মারাতেব হতে পারে। কেউ হয়ত চার আনা বুঝবে, কেউ হয়ত ছয়
আনা বুঝবে, কেউ হয়ত আট আনা বুঝবে, কেউ হয়ত কিছুই বুঝবে না। এটা নিয়ে
চিন্তা করার কিছু নেই। কারণ এই মুতালার উদ্দেশ্য হল মা‘লুমাত থেকে
মাজহুলাত আলাদা করা। এবং বোঝার চেষ্টা করা। একেবারে খালিউজ জেহেনে
দারসে না বসা।
২) নিয়মিত দরসে উপস্থিত থাকা।
মনে রাখবে, যে ছাত্র একটি দরসও কামাই দেয়, সে গত এক সপ্তাহে যতটুকু
এগিয়ে গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে যায়। তাই দরসে উপস্থিত থাকা খুব
গুরুত্বপূর্ণ। তবে দরসে শুধু শরীর নিয়ে উপস্থিত থাকলেই হবে না। বরং “আমি আজকের পড়াটা বুঝবই” এমন সংকল্প নিয়ে দরসে বসা। “তাকরারে বুঝে নিব” এধরনের চিন্তাভাবনা পরিহার করা।
# দরসে পিনপতন নীরাবতা ( الإصغاء ) অবলম্বন করা। অপ্রয়োজনীয় কথাবর্তা বা হৈ হুল্লোড় না করা।
# কান পেতে (الاستماع) উস্তাদের সব কথা শোনা
# গভীর মনোযোগ সহকারে উস্তাদের পড়া বোঝা। বুঝে না আসলে আদবের সাথে প্রশ্ন করা।
৩) তাকরার করা
তাকরার খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এর মাধ্যমে ইফহাম-তাফহিমের মাদ্দাহ তৈরি
হয়। অনেক আলেম আছেন, যারা অনেক ইলম ওয়ালা। কিন্তু তারা আরেক জনকে
নিজেদের মনের কথা বুঝাতে পারেন না। তারা কিন্তু ইন্তেকালের সময় নিজেদের
ইলম নিয়েই কবরে যাবেন। কেউই তাদের ইলমের দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না।
তাই নিজের মনের কথা যেন সাবলীলভাবে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, সেজন্য
গুরুত্ব সহকারে তাকরার করা ও তাকরারে বসা।
থানভী সাহেব বলেন, ইস্তেদাদের জন্য এই তিনটি হল জিনিস ফরজ। আরেকটি
জিনিস মুস্তাহাবের পর্যায়ের। সেটা হল--
৪) প্রতিদিন পেছনের কিছু পড়া পুরাবৃত্তি করা।
আমি এখানে আরেকটি কথা যোগ করতে চাই, তা হল,
৫) মুযাকারা করা।
দুজন দুজনে মুযাকারার দ্বারা অনেক কিছু হল হয়ে যায়। ইফহাম তাফহিমের মাদ্দাহ পয়দা হয়। তাই মুযাকারার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আল্লাহ, এই কথাগুলোর মধ্য যেগুলো অকল্যাণকর, সেগুলো আমাদের অন্তর থেকে মুছে দিন। আর যেগুলো আমাদের জন্য উপকারী, নাফে, মুফিদ সেগুলোকে আমলে আনার তাওফিক দান করুন ।
কপি পেস্ট